শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬
মুন্সীগঞ্জের সময়

শিরোনাম:

● আলিমে পাসের হার ৬১.৭ শতাংশ, জিপিএ-৫ পেয়েছেন ৩ হাজার ২৫০ জন ● এইচএসসিতে পাসের হার ৫২.১২ শতাংশ, জিপিএ-৫ পেলেন ৪০ হাজার ৮৪ জন ● মক্কা চুক্তিতে যুক্ত হলে দক্ষিণ এশিয়ায় নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা বিঘ্নিত হতে পারে ● টানা ছুটি শেষে কর্মচাঞ্চল্য ফিরেছে বেনাপোল বন্দরে ● মনপুরায় বিএনপির সহ-সভাপতি সেলিম মোল্লার বিরুদ্ধে জেলেদের সরকারি চাল বিক্রির অভিযোগ ● ইসরাইলে নির্বাচন শেষে অচলাবস্থা,সরকার গঠনে সামনে ৪ পথ খোলা রয়েছে ● বিমানবাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তাহসিফের মোটরসাইকেল টঙ্গী থেকে উদ্ধার ● দুই আসামি গ্রেপ্তার, নগদ ১ লাখ ৩৪ হাজার টাকা ও তিনটি স্ট্যাম্প জব্দ ● ৮৭ কোটি টাকার কাজে অনিয়মের অভিযোগ,পরিদর্শনে এমপি নুরুল ইসলাম ● ব্যাপক অনিয়ম ও বলপ্রয়োগের অভিযোগ জামায়াতের,ইসির নিষ্ক্রিয়তায় গভীর উদ্বেগ....সেক্রেটারি
Ad for sale 870 x 100 Position (1)
Position (1)

আমার দেখা জাতীয় নির্বাচন ও মুন্সীগঞ্জের অতীত-বর্তমান-২

মুহাম্মদ মাসুদ রানা

প্রকাশ : রবিবার, ১৯ জুলাই,২০২৬, ০৭:৩৪ এ এম
আমার দেখা জাতীয় নির্বাচন ও মুন্সীগঞ্জের অতীত-বর্তমান-২

 

​নির্বাচনী প্রহসন ও এক অন্ধকার অধ্যায়
একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাসে এক কালো অধ্যায় হয়ে থাকবে। মুন্সীগঞ্জ-৩ আসনে বিএনপির মনোনয়ন পান আব্দুল হাই ভাই। তবে নির্বাচনী মাঠ ছিল সম্পূর্ণ আওয়ামী লীগ নিয়ন্ত্রিত। আওয়ামী লীগের পরিকল্পনা ছিল বিএনপিকে নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় নামিয়ে এনে একতরফাভাবে বিজয় নিশ্চিত করা। প্রচারণা চালাতে না দেওয়া, নেতাকর্মীদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে হয়রানি করা এবং ভোটের আগের রাতেই ব্যালট বাক্স পূর্ণ করার মতো কর্মকাণ্ড ছিল সেই প্রহসনের চূড়ান্ত রূপ।

​২২ ডিসেম্বরের স্মৃতি:
নির্বাচনী কার্যক্রম শেষে মুক্তারপুর থেকে ফেরার পথে নয়াপাড়া মাজারের কাছে আমি ও আমার সহযোদ্ধা সুমন ভয়াবহ হামলার শিকার হই। সেদিন নৌকার মিছিল থেকে আমাদের ওপর হামলা চালানো হয়। পিস্তল থেকে গুলি লক্ষ্যভ্রষ্ট হলেও, চাকু ও ইটের আঘাতে রক্তাক্ত হই।প্রয়াত জাকির কাউন্সিলরের অসীম সাহসিকতায় ও নয়াগাও এর কিছু মানুষের সহযোগিতায় সেদিন আমি নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে ফিরেছিলাম। হাসপাতালে গিয়েও শান্তি ছিল না; পুলিশ আমাকে গ্রেফতারের জন্য সেখানে উপস্থিত হয়। চিকিৎসা না নিয়েই আমাকে আত্মগোপনে যেতে হয়েছিল। সেই নির্বাচন ছিল এক ফ্যাসিবাদী শক্তির অশুভ উন্মাদনা।

বর্তমান সংসদ সদস্য কামরুজ্জামান রতন ভাই তখন জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক। নির্বাচনে অসহযোগিতা বা নিষ্ক্রিয়তা তাদের মধ্যে দূরত্ব বাড়িয়ে দেয়। দূরত্ব থেকে বিরোধে রূপ নিলে  একপার্যায়ে আব্দুল হাই প্রয়াত দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার কাছে যেয়ে পদত্যাগ পত্র জমা দেন। কিন্তু দেশনেত্রী তার ওই সিদ্ধান্তে রাজী ছিলেন না এবং তিনি হাই ভাইকে বলেছিলেন- মুন্সীগঞ্জে আমি আপনার উপরেই আস্থা রাখি, আপনি আরো ভেবে আমাকে জানান, আমি অপেক্ষা করবো আপনার সিদ্ধান্তের। হাই ভাইয়ের ওই পদত্যাগ পত্র জমা দেবার বিষয়টি কেউ জানতো না। পরে যখন জানতে পারেন তখন প্রয়াত শাহজাহান খান ও মো. মহিউদ্দিন তাকে বুঝিয়ে সিদ্ধান্ত পরিবর্তনে রাজী করান।মুন্সীগঞ্জ জেলা বিএনপির নতুন কমিটি ঘোষনা করা হয় আব্দুল হাই আহবায়ক, কামরুজ্জামান রতন সদস্য সচিব।

দীর্ঘ ফ্যাসিবাদী শাসনের বিরুদ্ধেও আলহাজ্ব আব্দুল হাই জেলা বিএনপির নেতৃত্ব দিয়ে আসছিলেন সফলতার সাথেই। ২০২১ সালে দিকে একটি দুঃসংবাদে মুন্সীগঞ্জ বিএনপির পরিবারে নেমে আসে দুঃশ্চিন্তার কালো ছায়া। হাই ভাই তার স্ত্রীর চিকিৎসার জন্য থাইল্যান্ডে যান। সেখানে শারীরিক চেক-আপ এর পর হার্টে ব্লক ধরা পরলে ওপেন হার্ট সার্জারি করানো হয়।কিন্তু দূর্ভাগ্যক্রমে তার ব্রেইন স্ট্রক হয় এবং বা দিক প্যারালাইজড হয়ে যায়। এতে জেলা বিএনপির নেতৃত্বে এক সংকটময় পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। আব্দুল হাই ছিলেন সমস্ত নেতাকর্মীর প্রানশক্তি। তার আকস্মিক অসুস্থতায় নেতাকর্মীদের মনোবল ভেঙে পড়েছিল। তার সুস্থ হয়ে উঠার কোন সম্ভবনা ছিল না। বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির ঢাকা বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক এড. আব্দুস সালাম আজাদ ও সহ সাংগঠনিক সম্পাদক বেনজির আহমেদ টিটু ভাইয়ের সুচিন্তিত ও বিচক্ষন সিদ্ধান্তের ফলে এই পরিস্থিতি কাটিয়ে জেলা বিএনপি আবার গতিশীল হয়েছিল। আব্দুল হাইয়ের ছোট ভাই মো. মহিউদ্দিনকে তারা জেলা বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম আহবায়ক করা হয় যাতে জেলা বিএনপির আহবায়ক হাই ভাইয়ের অবর্তমানে সি.যুগ্ম আহবায়ক তার দায়িত্ব পালন করতে পারেন। এই সময়োপযোগী সিদ্ধান্তের ফলে মো. মহিউদ্দিন জেলা বিএনপির নেতৃত্বে আসেন।

মহিউদ্দিনকে দূর থেকে যার চিনতো তারা জানতো আব্দুল হাইয়ের ভাই মহিউদ্দিন হিসেবেই। আর নেতাকর্মীদের কাছে তিনি ছিলেন সুখে দুখে সব সময় পাশে থাকা একজন নির্ভরযোগ্য অভিভাবক হিসেবে। বলা যায় নক্ষত্রের আড়ালে ঢাকা পড়া আরেক নক্ষত্র মহিউদ্দিন ভাই । আব্দুল হাই নেতৃত্বে থাকাকালীন সময়ে তিনি ব্যাক-আপ লিডারশীপের ভূমিকাতেই বেশী ছিলেন। দলের যেসকল কর্মকান্ড সে সময় যা দৃশ্যমান সবাই দেখত তা বাস্তবায়নে আড়াল থেকে নিরব কারিগর ছিলেন মহিউদ্দিন ভাই।

​২১শে সেপ্টেম্বরের প্রতিরোধ:

এক নতুন জাগরণ২০২২ সালের ২১ সেপ্টেম্বরে। দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতি ও খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবীতে দেয়া কর্মসূচীর নেতৃত্বে ছিলেন মহিউদ্দিন ভাই। মুক্তারপুরের সে সমাবেশস্থলে একেরপর এক মিছিল আসতে শুরু করে। আওয়ামীলীগ ও আইনশৃঙ্খলাবাহিনী ভেবে নিয়েছিল যেহেতু দীর্ঘ দিন বিএনপি সেভাবে কোন কর্মসূচী পালন করছিল না, তাই এই কর্মসূচীকেও তারা সাধারণ ভাবে নিয়েছিল এবং ভেবেছিল হয়ত হাজারখানিক লোকের উপস্থিতি হবে।

কিন্তু মুহুর্তেই তাদের সে ধারনা ভূল প্রমান করে সমাবেশে হাজারের হাজার নেতাকর্মীর ঢল আসতে শুরু করে।ধারনামতে দশহাজার নেতাকর্মীর উপস্থিতি ছিল সে সমাবেশে।পুলিশ এই বিশাল সংখ্যক নেতাকর্মীর উপস্থিতি বুঝতে পারে সমাবেশ বন্ধ করার পায়তারা শুরু করে।শান্তিপূর্ণ সেই কর্মসূচী ছত্রভঙ্গ করতে আক্রমনাত্মক হয়ে উঠে পুলিশ, ব্যানার কেড়ে নেয়, বিনা উস্কানিতে লাঠিচার্জ শুরু করে।একপর্যায়ে নেতাকর্মীরা ক্ষিপ্ত হয়ে উঠলে পুলিশ তাদের উপর গুলি চালায়।নেতাকর্মীরা ইট পাটকেল নিক্ষেপ করলে পুলিশ আত্মরক্ষায় পিছনে চলে যায়।বিক্ষুব্দ নেতাকর্মীরা সামনের দিকে অগ্রসর হতে থাকে।

কেউ একজন বলছিল পুলিশের গুলি শেষ সামনে আগাও! হয়ত শাওন সত্যি ভেবে নিয়েছিল পুলিশের গুলি শেষ। সে বাশ হাতে পুলিশের খুব কাছাকাছি চলে যায় আর অমনি একটি বুলেট তার মাথায় আঘাত করে।তার মাথায় থাকা ক্যাপটি ছিটকে ১০ মিটার দূরে যেয়ে পরে।আর শাওন বাশ হাতে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে।এই ঘটনায় নেতাকর্মীরা আরো ক্ষিপ্ত হয়ে অসীম সাহসীকতায় সামনে এগিয়ে যেতে থাকে তাদের মধ্যে মৃত্যুর ভয় ছিল না, তারা বুলেটের সামনে বুক পেতে দিয়েছিল।আমার থেকে একটু দূরে দাঁড়িয়ে নেতাকর্মীদের উজ্জীবিত করছিল  জাহাঙ্গীর।মুহুর্তেই একটা রাবার বুলেটের শব্দ জাহাঙ্গীর মাটিতে পরে থাকে। পর পর আরো কয়েকটি গুলিতে নেতাকর্মীরা পিছনে চলে আসে।জাহাঙ্গীরকে ৬নং ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি মীর শরীফ ও শহর যুবদলের যুগ্ম আহবায়ক মজিবর রহমান চঞ্চল রক্তাক্ত অবস্থায় জাহাঙ্গীরকে উদ্ধারের চেষ্টা করেছিল।আমি জাহাঙ্গীরের রক্তাক্ত মুখ দেখে ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম তাকে ধরার সাহস হয়ে উঠেনি আমার।পরে অসীম সাহসি কিছু নেতাকর্মী জাহাঙ্গীরকে উদ্ধার করে আনে।

নেতাকর্মীদের প্রতিরোধের মুখে প্রান বাঁচাতে পুলিশ সেখান থেকে পালিয়ে যায়, কেউ কেউ আটকা পরে আর কিছু পুলিশ প্রান বাঁচাতে নদীতে  ঝাপিয়ে পড়ে প্রান বাঁচানোর চেষ্টায়।নেতাকর্মীরা জাহাঙ্গীর ও শাওনকে চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিক্যালে নিয়ে যায়।চিকিৎসাধীন অবস্থায় পরেরদিন রাত ৮টায় শাওন মারা যায়।

আর জাহাঙ্গীরকে  ডা.কানন ভাইয়ের পরামর্শে আমি বন্ধু মেহের কায়সার রানা, তাজুল, মাইনুল, মাহফুজ, এর সহযোগিতায় ভোরে ঢাকা মেডিক্যাল থেকে লুকিয়ে বের করে উন্নত চিকিৎসার জন্য পপুলার হাসপাতালে নিয়ে যাই।কারন তার দ্রুত সময়ের মধ্যে যে চিকিৎসা প্রয়োজন ছিল তা মেডিক্যালে রেখে হওয়া সম্ভব না। জাহাঙ্গীরের চিকিৎসার ব্যয় হয় প্রায় ১৪ লক্ষ টাকা। যা আব্দুল্লাহ ভাই ও মহিউদ্দিন ভাইয়ের সহযোগিতায় বিল পরিশোধ করা হয়।

বুলেটের সামনে নেতাকর্মীরা যেভাবে দাড়িয়েছিল প্রতিরোধ গড়েছিল তা শুধু মুন্সিগঞ্জের জন্য নয় বরং  ফ্যাসিবাদী বিরুদ্ধে সারা বাংলাদেশের নেতাকর্মীদের জন্য অনুপ্রেরণা হয়ে উঠেছিল সেই প্রতিরোধ।যে সময়ে পুলিশ যখন এক দানবীয় আতংকের নাম, সেখানে সেই দানবদের পিটিয়ে নদীতে ফেলে দেবার ঘটনাটি সত্যিই সমগ্র বাংলাদেশে বিএনপির নেতাকর্মীরা এই বিশ্বাসটা ফিরে পেয়েছিল যে- আমরাও প্রতিরোধ গড়তে জানি।কারন নির্যাতন আর নিপীড়নের ফলে প্রতিরোধ করতে ভূলে গিয়েছিল যে বিএনপি সে বিএনপি চাইলেই যে প্রতিরোধ গড়তে পারে হারানো এই বিশ্বাসটা ফিরে পেয়েছিল মহিউদ্দিন ভাইয়ের নেতৃত্বে সেদিনের সেই প্রতিরোধ।

২১শে সেপ্টেম্বরের সেইদিনের প্রতিরোধটিই নতুন করে ঘুড়ে দাড়ানোর অনুপ্রেরনা হয়ে উঠেছিল যার নেতৃত্বে ছিলেন মহিউদ্দিন।সেদিনের ঘটনার পর কেন্দ্র বুঝতে সক্ষম হয় মহিউদ্দিন শুধু আব্দুল হাইয়ের ভাই হিসেবেই নয় নিজ যোগ্যতা বলেই নেতৃত্ব দিতে সক্ষম।আব্দুল হাইয়ের ভাই মহিউদ্দিনের খোলসের আবরণ ছেড়ে সকলের কাছে প্রকাশিত শক্তিমান ও জনপ্রিয় নেতা মহিউদ্দিন হয়ে উঠার গল্প বলা যায়।

​একজন দক্ষ সংগঠকের আত্মপ্রকাশ
আব্দুল হাই ভাইয়ের ছায়াসঙ্গী হিসেবে পরিচিত মহিউদ্দিন ভাই খুব দ্রুতই তার নিজের সক্ষমতার প্রমাণ দেন। তার এই আপসহীন সংগ্রামের স্বীকৃতিস্বরূপ দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান তাকে জেলা বিএনপির সদস্য সচিব মনোনীত করেন।

​মুন্সীগঞ্জের মাটিতে আব্দুল হাই ভাইয়ের যোগ্য উত্তরসূরি হিসেবে মহিউদ্দিন ভাই যে নেতৃত্বের পরিচয় দিয়েছেন, তা কেবল স্থানীয় রাজনীতি নয়, বরং জাতীয় রাজনীতির প্রেক্ষাপটেও এক অনন্য দৃষ্টান্ত। একজন 'ছায়ার নক্ষত্র' থেকে তিনি আজ মুন্সীগঞ্জ বিএনপির এক শক্তিশালী অভিভাবকে পরিণত হয়েছেন।

➖ লেখক- মোহাম্মদ মাসুদ রানা, জাতীয়তাবাদী যুবদল মুন্সীগঞ্জ জেলা শাখার সাবেক সদস্য সচিব।

ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

Ad for sale 270 x 200 Position (2)
Position (2)