আহমেদ স্বপ্নীল, মুন্সীগঞ্জের সময় ডেক্স
বাংলা ও সমগ্র উত্তর-ভারতীয় উপমহাদেশের কৃষি-সংস্কৃতির অন্যতম প্রাচীন ও সমৃদ্ধ ফসল আখ। প্রাচীন বঙ্গের প্রাণকেন্দ্র এবং ইতিহাসের গৌরবোজ্জ্বল জনপদ বিক্রমপুরে (বর্তমান সিরাজদিখান, শ্রীনগর, টঙ্গীবাড়ি, লৌহজং ও মুন্সীগঞ্জ সদর অংশ) আখ চাষের ইতিহাস কেবল একটি কৃষিপণ্যের উৎপাদন নয়—এটি এই জনপদের সভ্যতা, অর্থনীতি, বাণিজ্য এবং লোকজীবনের অবিচ্ছেদ্য ইতিহাস। নির্দিষ্ট কোনো একটি সাল খাতায় কলমে লিপিবদ্ধ না থাকলেও, প্রত্নতাত্ত্বিক ও ভাষাতাত্ত্বিক প্রমাণ বলে বিক্রমপুরের পলিমাটিতে আখের উপস্থিতি হাজার বছরেরও পুরোনো।
প্রাচীন উৎপত্তি ও বৈদিক সাহিত্য (খ্রিস্টপূর্ব ২০০০ – ৫ম শতাব্দী) প্রাচীন বৈদিক সাহিত্য এবং ভারতীয় চিকিৎসাশাস্ত্রের আকর গ্রন্থ ‘চরক সংহিতা’ ও ‘সুশ্রুত সংহিতায়’ বাংলায় উৎপন্ন উচ্চমানের 'পৌণ্ড্রক' (বা লোকমুখে 'পুঁড়ি') জাতের আখের সুস্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে। প্রাচীন ভাষাতাত্ত্বিক ও ইতিহাসবিদদের মতে, বঙ্গ ও গৌড় অঞ্চলের অন্যতম প্রধান পরিচয় ছিল আখ থেকে প্রস্তুত সুস্বাদু 'গুড়'। এমনকি 'গৌড়' শব্দটির বাণিজ্যিক ও ভাষাতাত্ত্বিক উৎপত্তি আখজাত গুড়ের সাথেই সম্পর্কিত। পদ্মা, ইছামতী ও ধলেশ্বরীর পলি-প্লাবিত প্রাচীন বিক্রমপুর অববাহিকা তার অতি উর্বর মাটির কারণে খ্রিস্টপূর্ব যুগ থেকেই চিবিয়ে খাওয়ার আখ ও রস থেকে গুড় তৈরির প্রাথমিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে ওঠে।
রাজকীয় স্বর্ণযুগ ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য (১০ম – ১৬শ শতাব্দী) দশম থেকে ত্রয়োদশ শতাব্দীতে বিক্রমপুর যখন চন্দ্র, বর্মন এবং সেন রাজবংশের রাজধানী ও বঙ্গ অঞ্চলের মূল প্রশাসনিক কেন্দ্র ছিল, তখন এখানকার কৃষিব্যবস্থায় আখের প্রাধান্য আরও বৃদ্ধি পায়। পরবর্তীতে ১৫৭২–১৫৮০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যবর্তী সময়ে মুঘল সম্রাট আকবরের আমলে তাঁর বিখ্যাত রাজস্ব মন্ত্রী রাজা টোডরমল যখন রাজস্ব ব্যবস্থার সংস্কার করেন, তখন ‘বিক্রমপুর’কে সুবা বাংলার একটি অন্যতম সমৃদ্ধ ও গুরুত্বপূর্ণ পরগনা হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়। এই আমলে বিক্রমপুরের খাঁটি গুড় ও স্থানীয় চিনি পর্তুগিজ, ওলন্দাজ ও মুঘল বণিকদের মাধ্যমে দূর-দূরান্তে রপ্তানি হতো এবং মুঘল দরবারেও এই অঞ্চলের মিষ্টি পণ্যের কদর ছিল।
উপনিবেশ উত্তর আধুনিক প্রেক্ষাপট ও আলুর সাথে সাথী ফসল- বিংশ শতাব্দীর শেষভাগে বিক্রমপুর অঞ্চলটি 'বাংলাদেশের আলুর রাজধানী' হিসেবে খ্যাতি অর্জন করলেও আখের ঐতিহ্য কখনো মুছে যায়নি। বর্তমান যুগে সিরাজদিখান ও শ্রীনগর উপজেলায় কৃষকরা আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয়ে পুনরায় আখ চাষে বিপুল সাফল্য পাচ্ছেন। বিশেষ করে আলুর সাথে সাথী ফসল (Intercropping) হিসেবে একই জমিতে আখের আবাদ কৃষকদের জন্য বাড়তি অর্থকরী লাভের দুয়ার খুলে দিয়েছে। সিরাজদিখান ও শ্রীনগরের মিষ্টি গেন্ডারি আখ এবং স্থানীয়ভাবে তৈরি খাঁটি গুড় বর্তমানে স্থানীয় বাজার ছাপিয়ে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বাণিজ্যিকভাবে সরবরাহ করা হচ্ছে।
বিক্রমপুরে আখ চাষের ঐতিহাসিক বিবর্তন
খ্রিস্টপূর্ব ২০০০–৫০০ বছর (প্রাচীন যুগ): বৈদিক সাহিত্য ও প্রাচীন চিকিৎসাগ্রন্থে আখের উল্লেখ; বিক্রমপুর অববাহিকায় আদিবাসী পর্যায়ে আখের আদি প্রচলন।
১০ম–১৩শ শতাব্দী (রাজধানী আমল): সেন ও চন্দ্র রাজাদের রাজত্বকালে বিক্রমপুর অঞ্চলে চিনি ও গুড় উৎপাদনের জন্য আখের ব্যাপক বিস্তৃতি। ১৫৭২–১৫৮০ খ্রিস্টাব্দ (মুঘল পরগনা): টোডরমলের রাজস্ব তালিকায় বিক্রমপুর পরগনার অন্তর্ভুক্তি ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিস্তার।
বর্তমান যুগ (আধুনিক পুনরুত্থান): সিরাজদিখান ও শ্রীনগরে আলুর সাথে সাথী ফসল হিসেবে আখের আধুনিক প্রযুক্তিভিত্তিক চাষ ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি। প্রাচীন রূপপল্লী ও ঐতিহাসিক রাজধানী বিক্রমপুর কেবল বিদ্যাচর্চা, রাজনৈতিক পটপরিবর্তন বা বিখ্যাত মনীষীদের জন্মভূমি নয়; বরং এই অঞ্চলের নদ-নদী বিধৌত উর্বর পলিতে হাজার বছর ধরে গড়ে ওঠা আখের মিষ্টি রস বাংলার অর্থনৈতিক ও কৃষি বুনিয়াদকে যুগের পর যুগ সমৃদ্ধ করে এসেছে।
সূত্র- বিক্রমপুর পরগনা,লেখক:মিজান আহম্মেদ বিক্রমপুরী